৭ জানুয়ারি নির্বাচন
নানামুখী চ্যালেঞ্জ-উৎকণ্ঠা ও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর হুমকি নিয়েইে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছেন কাজী হাবিবুল আউয়াল নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। বুধবার সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে জাতির উদ্দেশে ভাষণ প্রদানের মধ্য দিয়ে তফসিল ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। এর আগে, বিকাল ৫টার দিকে তফসিল সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালের সভাপতিত্বে সব কমিশনাররা এক জরুরি সভা করেছেন।
অতীতে রেকর্ড করা ভাষণের মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনাররা জাতীয় নির্বাচনের তফসিল দিলেও এবার সিইসির সেই ভাষণ বিটিভি ও বেতারে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। অতীতে কমিশন সভা শেষে ভাষণ রেকর্ড করে প্রচার করা হতো। এই প্রথমবার নির্বাচন ভবন থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে নির্বাচনী তফসিলসহ সিইসির ভাষণ।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন রোববার ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন সকাল ৮টা থেকে টানা ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, এই নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ৩০ নভেম্বর, মনোনয়নপত্র যাচিই-বাছাই ১ থেকে ৪ ডিসেম্বর, মনোনয়নপত্র বাতিল হলে এর বিরুদ্ধে আপিল ও আপিল নিষ্পত্তি ৬ থেকে ১৫ ডিসেম্বর, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার ১৭ ডিসেম্বর, প্রতীক বরাদ্দ ১৮ ডিসেম্বর। প্রচারণার জন্য ২২ দিন সময় রয়েছে। নির্বাচনে ৬৬ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ৫৯২ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তফসিল ঘোষণার ভাষণে সিইসি বলেন, ‘রাজনৈতিক মতানৈক্যের সমাধান প্রয়োজন। আমি সকল রাজনৈতিক দলকে বিনীতভাবে অনুরোধ করব, সংঘাত পরিহার করে সমাধান অন্বেষণ করুন। সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতা ও সমাধান অসাধ্য নয়।’
তিনি বলেন, ‘জনগণকে অনুরোধ করব, সকল উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অস্বস্তি পরাভূত করে নির্ভয়ে আনন্দমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে এসে অবাধে মূল্যবান ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে।’
এ সময় তিনি সংবিধান ও আইনের আলোকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেন।
এদিকে সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী গত ১ নভেম্বর দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ক্ষণ গণনা শুরু হয়েছে। চলতি একাদশ সংসদের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ২৯ জানুয়ারি। যার ফলে আগামী ২৯ জানুয়ারির মধ্যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর আগে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। দশম সংসদ ভোট হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। তার আগে নবম সংসদ নির্বাচনের তারিখ ছিল ২৯ ডিসেম্বর। অর্থাৎ সবশেষ জাতীয় নির্বাচনগুলো ডিসেম্বরের শেষ বা জানুয়ারির শুরুতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আগারগাঁও নির্বাচন কমিশন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। নির্বাচন ভবনের নিরাপত্তায় পুলিশ, র্যাব ও আনসার সদস্যদের নিয়োজিত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে নির্বাচন ভবনের ভেতরেও দর্শনার্থীদের বিষয়ে কড়াকড়ি করা হয়েছে। গাড়ি টহল দিচ্ছে; গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার প্রবেশ পথে ব্যারিকেড দেওয়া রয়েছে। দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচন কমিশন ভবনের আশপাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এছাড়াও ইসির নিরাপত্তা কর্মকর্তা জহুরা আক্তার বেগমের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, সব প্রকল্প, নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, মিডিয়া কর্মীদের সবার অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, নির্বাচন ভবনে প্রবেশের সময় অফিসিয়াল নির্দেশনা থাকার পরও কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিসের ইস্যুকৃত পরিচয়পত্র দৃশ্যমান অবস্থায় ঝুলিয়ে রাখছেন না। ফলে নিরাপত্তাকর্মীদের বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে বুধবার থেকে অফিসিয়াল আইডি ছাড়া নির্বাচন ভবনে প্রবেশ না করার জন্য এবং নির্বাচন ভবনে প্রবেশের সময় অফিসিয়াল পরিচয়পত্র দৃশ্যমান অবস্থায় অবশ্যই ঝুলিয়ে রাখার জন্য অনুরোধ করে ইসি।
এমন এক সময় সিইসি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছেন যখন সরকারের পদত্যাগ এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে রয়েছে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন করার অবস্থানে অনড়। একই দাবিতে ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। সেই নির্বাচনে জিতে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও ভোটের ফলে ভরাডুবির পর ‘আগের রাতে’ ভোট হয়ে যাওয়ার অভিযোগ তোলে। সংসদের মেয়াদের শেষ দিকে এসে তাদের নির্বাচিত এমপিরা সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। তবে এবার ২০১৪ সালের মত একই দাবিতে আন্দোলন করছে বিএনপি। পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে ফিরে এসেছে সংঘাতের পরিবেশ। যানবাহনে অগ্নিংযোগ আর নাশকতার ঘটনায় জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ। যুক্তরাষ্ট্র দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে নিঃশর্ত সংলাপের আহ্বান জানালেও বিবাদমান পক্ষগুলো তাতে সাড়া দেয়নি।
প্রার্থীদের মনোয়নপত্র দাখিলে যে কোনো জটিলতা এড়াতে এবারের নির্বাচনে অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। সেইসঙ্গে ই-ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অনলাইনে জামানতের টাকা পরিশোধের সুযোগও থাকছে। অন্যদিকে ভোটকেন্দ্রের নাম ও ভোটার নম্বর খুঁজে পাওয়ার ভোগান্তি কমাতে ‘বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যাপ’ নামে একটি অ্যাপ তৈরি করছে কমিশন। এই অ্যাপে ভোটারের তথ্যের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার (এসপি) এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের পরিচয় ও ফোন নম্বর দেওয়া থাকবে বলে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, দেশে মোট ভোটার ১১ কোটি ৯৬ লাখ ৯১ হাজার ৬৩৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৭ লাখ ৭১ হাজার ৫৭৯ জন। নারী ভোটার ৫ কোটি ৮৯ লাখ ১৯ হাজার ২০২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৮৫২ জন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ৩০০ আসনভিত্তিক ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করেছে ইসি। এ তালিকা অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ করা হবে। এ নির্বাচনে ভোট দেবেন ১১ কোটি ৯৬ লাখ ৯১ হাজার ৬৩৩ জন ভোটার। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ভোটার ছিল ১০ কোটি ৪২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৭ জন। সে হিসেবে ৫ বছরে দেশে ভোটার বেড়েছে ১ কোটি ৫৪ লাখ ৫২ হাজার ৯৫৬ জন।







